গ্রাম পুলিশের বেতন ২০২৪ || কত টাকা পান একজন গ্রাম পুলিশ?

আমাদের প্রিয় গ্রামকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে যে বাহিনী সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে, তা হলো গ্রাম পুলিশ। মেট্রোপলিটন পুলিশের মতো শহুরে এলাকায় সবসময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এমনটা সবসময় হয় না। 

গ্রাম পুলিশের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দায়িত্বের ফলে আমাদের গ্রাম রক্ষা পায় নানা ধরনের দুর্নীতি ও অপরাধ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা তাদের এই কাজের জন্য যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দিই না।

অনেকেই জানতে চান গ্রাম পুলিশের বেতন কত টাকা? সত্যি কথা বলতে তাদের বেতনের সঠিক মাপটা বলা কিছুটা কষ্টসাধ্য কেননা, তারা এই দিক থেকে আজও অবহেলিত। যদিও কিছু স্থানে স্পষ্ট তাদের বেতর, ভাতার কথা উল্লেখ্য রয়েছে, তবে অধিকাংশ স্থানে দেয়া যায় তাদের হাজার কোটি টাকা বেতন বকেয়া রাখা হয়েছে। 

তা যাইহোক, এই আর্টিকেলে জানাবো বর্তমানে গ্রাম পুলিশের বেতন কত, তাদের বেতন বৃদ্ধির কর্মসূচি ও প্রস্তাবিত গ্রাম পুলিশের বেতন স্কেল সম্পর্কে বিস্তারিত। 

গ্রাম পুলিশের কাজ ও দায়িত্ব

গ্রাম পুলিশের মূল কাজ হলো গ্রামীণ এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা, এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যার সমাধান করেন এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করেন। 

এছাড়া তারা অপরাধ তদন্ত, গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা, এবং জরুরি সময়ে স্থানীয় জনগণকে সহায়তা প্রদানেও জড়িত থাকেন। মূলত তাদের দৈনিক কর্মকান্ড গুলো কিছু কিছুটা এমন:

প্রতিদিন সকাল ৯ ঘটিকার মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে জাতীয় পতাকা তুলতে হয়। এরপর ঝাড়ু দিতে হয় অফিস। সময়ের সাথে সাথে এলাকার জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। 

তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে এক দিন থানায় প্রতিবেদন দিতে হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে। এবং মাসে এক দিন ইউএনও কার্যালয়ে কাজ করতে হয়। এগুলো ছাড়াও রয়েছে ইউপির বিভিন্ন ধরনের কাজ। 

বর্তমানে গ্রাম পুলিশের বেতন ও পারিশ্রমিক

গ্রাম পুলিশের বেতন বরাবরই আলোচনার বিষয় হয়ে এসেছে। একজন দিনমজুরের মজুরি যেখানে দৈনিক ৫০০ টাকা, মাসে ৩০ দিনে দাঁড়ায় ১৫০০০ টাকা, সেখানে একজন গ্রাম পুলিশের বেতন ৬৫০০ টাকা। 

যদিও তাদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাদের বেতন দীর্ঘদিন ধরেই ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম পুলিশ কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ৯ জন করে গ্রাম পুলিশ কর্মরত আছেন যাদের বলা হয় মহল্লাদার এবং ১ জন মনিটর রয়েছে যাকে বলা হয় দফাদার। 

বর্তমানে একজন গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন ৬,৫০০ টাকা। যার মধ্যে ৩২৫০ টাকা দেয়া হয় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে আর বাকি ৩২৫০ টাকা দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। 

অন্যদিকে একজন দফাদারের বেতন ৭০০০ টাকা, যার মধ্যে ৩৫০০ টাকা দেয়া হয়  স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আর বাকি ৩৫০০ টাকা দেয়া হয়  সংশ্লিষ্ট ইউপি থেকে।  

গ্রাম পুলিশের বেতন বৃদ্ধি: সর্বশেষ আপডেট

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে গ্রাম পুলিশের বেতন জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৭৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি পরিপত্রও জারি করেছিল। তবে এরপর থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। 

বহু বছর ধরে তাঁরা এই দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। দফাদারদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের ১৯তম গ্রেড এবং মহল্লাদারদের জন্য ২০তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের দাবিতে তাঁরা প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করেছেন।

তবে প্রায় পাঁচ বছর পর, প্রায় ৪৭ হাজার গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে একটি সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। খুব শিগগিরই এই সুপারিশ অনুযায়ী গ্রাম পুলিশের বেতন ও অবসর ভাতা বৃদ্ধি করা হবে।

২০২৪ সালে গ্রাম পুলিশের বেতন বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাবিত পরিবর্তন 

বর্তমানে দেশের ৪৫৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদে ১০ জন করে গ্রাম পুলিশ কর্মরত আছেন। এর মধ্যে একজন দফাদার এবং নয়জন মহল্লাদার হিসেবে কাজ করেন। দফাদারদের বর্তমান বেতন ৭,০০০ টাকা, যা বাড়িয়ে ৮,৫০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি তাদের বেতনে ২১.৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি আনবে। একইসঙ্গে, তাদের অবসর ভাতা ৬০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০,০০০ টাকা করা হয়েছে, যা ২৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি।

অন্যদিকে, মহল্লাদারদের বর্তমান বেতন ৬,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭,৫০০ টাকা করা হয়েছে, যা ১৫.৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। তাদের অবসর ভাতাও ৫০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫০,০০০ টাকা করা হয়েছে, যা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি।

গ্রাম পুলিশের বেতন নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া

গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট গ্রাম পুলিশের দফাদারদের জন্য ১৯তম এবং মহল্লাদারদের জন্য ২০তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের নির্দেশ দেন। এছাড়াও, ২০১১ সালের ২ জুন থেকে তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত।

চুড়ান্ত মন্তব্য 

বর্তমান সময়ের কথা চিন্তা করে বিবেচনা করলে দেখা যায় একজন গ্রাম পুলিশের যে বেতন স্কেল তা দিয়ে একটা সংসার ঠিক ভাবে পরিচালন করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। 

তাছাড়া তাদের উপর যে কর্ম দায়িত্ব রয়েছে সেগুলো করার পর এক্সট্রা সময় থাকে না যে সময় এক্সট্রা কিছু উপার্জনের রাস্তা বের করতে পারে। এমতাবস্থায়, সরকারের দ্রুত দৃষ্টি দেয়া উচিৎ আলোচনার বাইরে থাকা গ্রাম পুলিশ ও তাদের বেতন স্কেলের দিকে। 

Leave a Comment