সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত 

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুরা যে সমাজের অংশ, তাদেরও জীবনকে পূর্ণভাবে উপভোগ করার অধিকার রয়েছে। সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কেননা এতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মান উন্নত করতে সহায়তা করছে। 

সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম

একসময় এমন শিক্ষার সুযোগ ছিল না, যা তাদের জন্য উপযোগী। তবে ১৯৭৪ সালে এই কার্যক্রম চালু করার মাধ্যমে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুরা এখন সাধারণ বিদ্যালয়ের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পড়াশোনা করতে সক্ষম হয়েছে। 

সমন্বিত শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে একই ক্লাসে পড়াশোনা করে, এবং তাদের শিক্ষা অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু বাধা রয়েছে:

  • অব্যাপ্ত প্রশিক্ষণ

অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে, যা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।

  • স্বল্প উপকরণ

ব্রেইল পদ্ধতির বই, অডিওবুক, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

  • সামাজিক মনোভাব

অনেক সময় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব থাকে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষায় অংশগ্রহণের পথে অন্তরায় হতে পারে।

কীভাবে কাজ করে এই কার্যক্রম?

প্রতিটি বিদ্যালয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘রিসোর্স শিক্ষক’ নিযুক্ত করা হয়। এই শিক্ষকরা ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ১০টি আসন বরাদ্দ থাকে। এতে শিশুদের পঠন-পাঠন ছাড়াও তাদের আবাসন, খাদ্য এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয়তা সমাজসেবা অধিদফতর দ্বারা পূরণ করা হয়।

সেবা প্রদান:

  • দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে।
  • আবাসিক/অনাবাসিক থাকার ব্যবস্থা ও ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হয়।
  • শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়।

সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের মূল উপাদান সমূহ 

বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক

প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে একজন ‘রিসোর্স শিক্ষক’ নিয়োজিত থাকেন, যিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেন। এই শিক্ষকরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত, যাতে তারা কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে পারেন।

ব্রেইল পদ্ধতি

শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে লেখা, পড়া এবং শিখানো হয়, যা তাদের শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্যুত না হয়ে সঠিকভাবে শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করে।

সহযোগিতা এবং সমর্থন

শিক্ষকদের পাশাপাশি অন্যান্য সহপাঠী এবং অভিভাবকদের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।

সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উপকারিতা 

  • সমাজে সমতা: দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে একই শ্রেণীকক্ষে পড়াশোনা করে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি অর্জন করে। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে তাদের ভূমিকা অনুধাবন করতে সহায়তা করে।
  • সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি: একসাথে শিক্ষালাভের মাধ্যমে তারা সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়, যা তাদের জীবনে অনেক বেশি উপকারী।
  • শিক্ষার মান উন্নয়ন: ব্রেইল পদ্ধতি এবং অন্যান্য সহযোগী উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্চ মানের শিক্ষা লাভ করতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে।
  • আবাসন ও ভরণ-পোষণ: শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ও খাদ্য ব্যবস্থা ব্যবস্থা করা হয়। এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এসব সুবিধা প্রদান করা হয়।
  • চিকিৎসা সহায়তা: ছাত্রদের চিকিৎসা সেবার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে।
  • পুনর্বাসন: শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা, চাকুরী প্রদান বা অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হয়।

সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য আবেদন 

আগ্রহী অভিভাবকদের নির্ধারিত ফরমে রিসোর্স শিক্ষক বা উপ-পরিচালক বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদনের পর, রিসোর্স শিক্ষক একটি তালিকা প্রস্তুত করেন এবং ভর্তি কমিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়। এরপর, নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং তারা নির্ধারিত বিদ্যালয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা শুরু করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এখনও বহু উন্নত দেশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত প্রযুক্তি এবং বিশেষ পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছে। বাংলাদেশের সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম ৬৪ জেলায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি কেন্দ্রেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এবং এটি সম্পুর্ণভাবে ফ্রী। 

প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে, অভিভাবকরা নির্ধারিত ফরমে শিক্ষার্থীর ভর্তি আবেদন করতে পারেন। কার্যক্রমের কোনো ব্যত্যয় হলে, কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সুযোগও রয়েছে।

উপসংহার

অতএব, সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম শুধুমাত্র একটি শিক্ষার প্রকল্প নয়, এটি সেই শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, যারা সমাজে অবহেলিত হয়ে পড়েছিল। এটি তাদের জীবনকে আরো সুন্দর ও সার্থক করে তোলার একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। 

তবে, আরও বৃহত্তর সুফল লাভের জন্য সামাজিক সচেতনতা, উপকরণের প্রাপ্যতা, এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান বৃদ্ধির প্রয়োজন। সরকারের এবং সমাজের সকল স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই কার্যক্রম আরও সফল হতে পারে, এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে।

Visited 156 times, 1 visit(s) today

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top