কখনও কি ভেবে দেখেছেন যে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হয়? তারা কিভাবে বিভিন্ন বিষয়ে শিখতে ও জানতে পারে? আসুন জানি সেই বিষয়ে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, যেন চোখের আলো নেই কিন্তু মনের আলোয় তারা উদ্ভাসিত।
ভাবুন তো, যদি আপনার সন্তান দেখতে না পায়, তাহলে তার শিক্ষার ব্যবস্থা কেমন হবে? কিভাবে তাকে শেখাবেন, কিভাবে সে জগৎটাকে অনুভব করবে? এই প্রশ্নগুলোই আমাদের আজকের ব্লগ পোষ্টের মূল বিষয়। আসুন, আমরা সবাই মিলে জানি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে। পাশাপাশি জানি কিভাবে শিক্ষা দেওয়া যায়?
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কত প্রকার?
দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা মানে শুধু অন্ধত্ব নয়। এর অনেক ধরন আছে। কারো হয়তো একদমই দৃষ্টি নেই, আবার কারো ক্ষীণ দৃষ্টি থাকতে পারে। ক্ষীণ দৃষ্টি মানে, তারা হয়তো সবকিছু ঝাপসা দেখে বা দেখতে অসুবিধা হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকতার এই পার্থক্যটা আরেকটু বুজে নেই:
১) সম্পূর্ণ অন্ধত্ব: যখন একজন ব্যক্তি আলো দেখতে পায় না এবং কোনো কিছুই দেখতে পায় না।
২) ক্ষীণ দৃষ্টি: যখন দৃষ্টিশক্তি দুর্বল থাকে, কিন্তু একেবারে অন্ধ নয়। তারা বড় অক্ষর বা বিশেষ চশমা ব্যবহার করে কিছুটা দেখতে পারে।
এছাড়াও আরও কিছু প্রকারভেদ আছে, যেমন – ক্ষেত্র সীমাবদ্ধতা (visual field defects), যেখানে চারপাশের দৃশ্য দেখতে সমস্যা হয়।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণ কি?
- জন্মগত কারণ: জন্মের সময় কিছু সমস্যার কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
- আঘাতজনিত কারণ: কোনো দুর্ঘটনার কারণে চোখে আঘাত পেলে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে।
- রোগ: ডায়াবেটিস বা গ্লুকোমার মতো রোগের কারণেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
শিশুদের বিকাশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার প্রভাব অনেক গভীর। তারা হয়তো অন্যদের মতো সহজে সবকিছু শিখতে পারে না, খেলাধুলা করতে পারে না, বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সমস্যা হতে পারে। তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষা এবং যত্নের প্রয়োজন।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সম্পর্কে কিছু এনালাইসিস (Data and Statistics)
জেনে রাখা ভালো যে, বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে কতজন শিশু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৯ মিলিয়ন শিশু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। বাংলাদেশেও এই সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। সঠিক সংখ্যা হয়তো বলা কঠিন, তবে ধারণা করা হয়, কয়েক লক্ষ শিশু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাজ করে এমন কিছু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা আছে, যারা এই শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছে। যেমন – সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা গুলোর মধ্যে বিএনএসবি (Bangladesh National Society for the Blind) অন্যতম।
সত্যি কথা বলতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার হার এখনো অনেক কম। তবে, ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বাড়ছে। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত, কিন্তু চেষ্টা করলে তারা অনেক কিছু করতে পারে।
বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার হার (বছর অনুযায়ী)
বছর | শিক্ষার হার (%) |
২০২০ | ১০ |
২০২১ | ১২ |
২০২২ | ১৪ |
২০২৩ | ১৬ |
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা পদ্ধতি (Educational Approaches for Visually Impaired Children)
এবার আসুন জেনে নেয়া যাক, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি কিরকম বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের কিভাবে শিক্ষা দেওয়া যায় সে সম্পর্কে। প্রাথমিকভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের ৩টি উপায়ে শিক্ষা প্রদান করা হয়, সেগুলো হলো:
ব্রেইল পদ্ধতি (Braille System)
ব্রেইল হলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আলোর দিশা। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে উঁচু করা ডট ব্যবহার করে অক্ষর তৈরি করা হয়, যা তারা স্পর্শ করে পড়তে পারে।
ব্রেইলের আবিষ্কারক লুই ব্রেইল, যিনি নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি ১৮২৯ সালে এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রেইল শেখাটা একটু কঠিন, তবে একবার শিখতে পারলে, এটি তাদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দেয়।
ব্রেইল লেখার জন্য ব্রেইল স্লেট ও স্টাইলাস ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও, এখন ব্রেইল ডিসপ্লে-ও পাওয়া যায়, যা কম্পিউটারের সাথে সংযোগ করে ব্যবহার করা যায়।
শ্রবণভিত্তিক শিক্ষা (Auditory Learning)
শ্রবণভিত্তিক শিক্ষা মানে শুনে শেখা। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অডিওবুক তাদের জন্য খুব দরকারি। তারা বইয়ের গল্প শুনে শিখতে পারে।
তাছাড়া রয়েছে স্পিচ-টু-টেক্সট প্রযুক্তি যা ব্যবহার করে, কোনো লেখা শুনে সেটাকে টেক্সটে রূপান্তরিত করা যায়। আবার, টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি দিয়ে টেক্সটকে শব্দে রূপান্তরিত করা যায়।
শ্রুতি লিখন বা অডিও রেকর্ডিং-এর মাধ্যমে শিক্ষকরা লেকচার রেকর্ড করে দিতে পারেন, যা বাচ্চারা পরে শুনে শিখতে পারে।
স্পর্শভিত্তিক শিক্ষা (Tactile Learning)
স্পর্শ করে শেখাটাও খুব জরুরি। স্পর্শভিত্তিক শিক্ষা মানে, কোনো জিনিস স্পর্শ করে তার আকার, আকৃতি ও গঠন সম্পর্কে জানা। ট্যাকটাইল গ্রাফিক্স ব্যবহার করে ছবি বা ম্যাপ তৈরি করা হয়, যা তারা স্পর্শ করে বুঝতে পারে। ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে, যেমন – রান্না করা বা হাতের কাজ করা, তারা অনেক কিছু শিখতে পারে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি সহায়ক প্রযুক্তি এবং উপকরণ
- আধুনিক প্রযুক্তি (Modern Technology)
আধুনিক প্রযুক্তি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অনেক সুযোগ নিয়ে এসেছে। কম্পিউটার ও মোবাইলে এখন অনেক অ্যাক্সেসিবিলিটি ফিচার আছে, যা তাদের জন্য ব্যবহার করা সহজ করে। JAWS ও NVDA-এর মতো বিশেষ সফটওয়্যার আছে, যা স্ক্রিনের লেখাকে পড়ে শোনাতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে তাদের জন্য উপযোগী অনেক গেমিং ও বিনোদনমূলক অ্যাপ-ও রয়েছে। (জানুন প্রতিবন্ধীদের খেলাধুলা সম্পর্কে)
- শিক্ষা উপকরণ (Educational Materials)
শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষা উপকরণ দরকার। যেমন: ব্রেইল বই তো অবশ্যই লাগবে। অডিও ও মাল্টিমিডিয়া রিসোর্সও খুব দরকারি। স্পর্শভিত্তিক গ্লোব ও ম্যাপ তাদের ভূগোল শিখতে সাহায্য করে। এবং অডিও লেকচার ও অনলাইন কোর্স-এর মাধ্যমে তারা ঘরে বসেই শিখতে পারে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতিতে সহায়তাকারী কয়েকটি সংস্থা
সংস্থার নাম | কার্যক্রম |
বিএনএসবি (BNSB) | শিক্ষা, পুনর্বাসন, স্বাস্থ্যসেবা |
Impact Foundation Bangladesh | চক্ষু শিবির, শিক্ষা সহায়তা |
Sight savers | অন্ধত্ব দূরীকরণ, শিক্ষা সহায়তা |
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি যেমনটা রয়েছে তা প্রসংশার দাবীদার তবে ভবিষ্যতে তাদের জন্য আরও উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। inclusive শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে সব শিশু একসাথে শিখতে পারবে। তাদের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের আরও পদক্ষেপ নিতে হবে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা দেওয়া শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক কাজ। তাদের সঠিক শিক্ষা ও সুযোগ দিলে, তারাও সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে তাদের পাশে দাঁড়াই এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ি।

প্রতিবন্ধী বিডি একটি সেবামূলক ওয়েবসাইট যেখানে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী শ্রেনীর নাগরিকদের প্রদানকৃত ভাতা ও অন্যান্য সেবা সমূহ নিয়ে তথ্য প্রদান করে থাকে। এছাড়াও সরকার দ্বারা প্রদানকৃত অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ সুবিধা নিয়েও জানানো হয়ে থাকে। তবে এটা কোনো সরকারি ওয়েবসাইট নয়।