দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা ভিশন ইমপেয়ারমেন্ট বলতে দৃষ্টিশক্তির এমন একটি অবস্থা বোঝায় যা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর ফলে ব্যক্তি দৈনন্দিন কাজ, যেমন—পড়াশোনা, হাঁটা বা গাড়ি চালানোর মতো কাজে সমস্যার সম্মুখীন হন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অবস্থার মধ্যে “নিম্ন দৃষ্টি” (Low Vision) এবং “অন্ধত্ব” (Blindness) অন্তর্ভুক্ত। এই অবস্থাগুলো সাধারণত চশমা, কন্টাক্ট লেন্স বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সহজে সমাধান করা যায় না।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কাকে বলে?
মূলত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলতে বোঝায় দৃষ্টিশক্তির এমন একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান এবং ফলে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনায় অসুবিধার সম্মুখীন হন। এটি হতে পারে মৃদু দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা, যেমন চোখের ঝাপসা দেখা, অথবা গুরুতর, যেমন সম্পূর্ণ অন্ধত্ব।
এই অবস্থা সাধারণত চশমা, কন্টাক্ট লেন্স বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সহজে সমাধান করা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতার অন্তর্ভুক্ত অন্ধত্ব এবং নিম্ন দৃষ্টি (low vision) শব্দগুলো প্রায়শই ব্যবহৃত হয়, যা জীবনযাপনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য
দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা ধীরে ধীরে বা হঠাৎ করেই বিকাশ লাভ করতে পারে। এর বিকাশ প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে সমস্যার কারণ এবং তার প্রকৃতির ওপর। নিম্নে এর বিকাশের প্রধান ধাপগুলো ব্যাখ্যা করা হলো:
- জন্মগত কারণ: কিছু ব্যক্তি জন্মগতভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হন, যা গর্ভাবস্থায় জিনগত ত্রুটি বা মাতৃস্বাস্থ্যের জটিলতার কারণে হতে পারে।
- শৈশবকালীন সমস্যা: অপুষ্টিজনিত সমস্যা বা সংক্রামক রোগের কারণে শিশুকালে দৃষ্টিশক্তির বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।
- প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা বিকশিত হতে পারে। এটি সাধারণত চোখের লেন্সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ফলে ঘটে।
- আঘাতজনিত কারণ: চক্ষু বা মাথায় আঘাতজনিত কারণে হঠাৎ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা হতে পারে।
তাছাড়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এর ধরণ, মাত্রা, এবং ব্যক্তির জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করে। যেমন –
১) দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মাত্রা: মৃদু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী থেকে সম্পূর্ণ অন্ধত্ব পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তির বিভিন্ন স্তর থাকে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি আংশিকভাবে দেখতে পারেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অন্ধত্ব দেখা দেয়।
২) দৃষ্টির ফোকাস সমস্যা: কিছু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কাছের বা দূরের বস্তু স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন না। এতে করে আলোর প্রতি অতিসংবেদনশীলতা বা রাতকানা হতে পারে।
৩) মোটর দক্ষতার প্রভাব: দৃষ্টিশক্তির অভাবে চলাফেরা বা দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা হয়। স্থান, দিক, এবং গভীরতার অনুভূতি সঠিকভাবে কাজ করে না।
৪) শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা: পড়ালেখায় ব্রেইল বা অডিওভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়। দৃষ্টিশক্তির অভাবে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সীমিত হতে পারে।
৫) মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি: দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা সাধারণত অন্য ইন্দ্রিয় যেমন শ্রবণশক্তি এবং স্পর্শশক্তি উন্নত করে তোলেন। তাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিক কার্যকর হতে পারে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকতার কারণ
বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতার সবচেয়ে সাধারণ কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে অসংশোধিত রিফ্রাকটিভ ত্রুটি (যেমন মায়োপিয়া, হাইপারমেট্রোপিয়া এবং অ্যাস্টিগমাটিজম।), ক্যাটারাক্ট, যা চোখের লেন্স ঝাপসা করে তোলে, অন্ধত্বের প্রধান কারণ।
গ্লুকোমা, যা চোখের চাপ বৃদ্ধি পেয়ে দৃষ্টিনাশ ঘটায়, একটি গুরুতর সমস্যা। এছাড়া ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, কর্নিয়ার সমস্যা এবং বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনও উল্লেখযোগ্য কারণ।
কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কজনিত সমস্যাও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা সৃষ্টি করতে পারে। নিম্মে বিষয়টি ব্রেকডাউন করে উপস্থাপন করা হলো:
ক্রমিক নম্বর | কারণ | বর্ণনা | অন্ধত্বের হার (%) |
১ | অসংশোধিত রিফ্রাকটিভ ত্রুটি | মায়োপিয়া, হাইপারমেট্রোপিয়া, অ্যাস্টিগমাটিজমের মতো চোখের দৃষ্টিক্ষমতার ত্রুটি। | 43% |
২ | ক্যাটারাক্ট | চোখের লেন্স ধূসর বা অস্বচ্ছ হয়ে যাওয়া। এটি অন্ধত্বের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। | 33% |
৩ | গ্লুকোমা | চোখের অভ্যন্তরে চাপ বৃদ্ধির ফলে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। | 2% |
৪ | বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং অন্যান্য | ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, কর্নিয়ার সমস্যা ইত্যাদি। | উল্লেখযোগ্য হার |
৫ | মস্তিষ্কের সমস্যাজনিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা | স্ট্রোক বা মাথায় আঘাতের ফলে সৃষ্ট সমস্যা। | উল্লেখযোগ্য হার |
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর প্রকারভেদ
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তারাই, যারা সম্পূর্ণ অন্ধ বা আংশিকভাবে দৃষ্টিহীন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা হয় ব্যক্তির চোখ কতটা দূরত্বে বস্তু পরিষ্কারভাবে দেখতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন ব্যক্তি ৬ মিটার দূরের বস্তু দেখতে না পারেন যা একজন সুস্থ মানুষ ৬০ মিটার দূর থেকে দেখতে পারেন, তবে তাকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলা হয়। এই নির্ধারণ প্রক্রিয়াটি চক্ষু পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং এটি মাপা হয় “স্নেলেন চার্ট” নামক বিশেষ একটি চার্টের সাহায্যে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতার প্রধানত দুই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। প্রথমত, দূরত্বের দৃষ্টিশক্তি অনুযায়ী, যেমন মৃদু, মধ্যম, গুরুতর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং অন্ধত্ব।
- মৃদু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী: ৬/১৮ বা তার চেয়ে ভালো দৃষ্টি।
- মধ্যম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী: ৬/১৮ থেকে ৬/৬০ এর মধ্যে দৃষ্টি।
- গুরুতর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী: ৬/৬০ থেকে ৩/৬০ এর মধ্যে দৃষ্টি।
- অন্ধত্ব: ৩/৬০ এর চেয়ে খারাপ দৃষ্টি।
দ্বিতীয়ত, নিকট দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা, যেখানে কেউ ৪০ সেন্টিমিটার দূরের লেখা বা বস্তু দেখতে অক্ষম হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মৃদু প্রতিবন্ধী থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ অন্ধত্ব।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলে করণীয়
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা হলে করণীয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সময়মতো চক্ষু পরীক্ষা করানো এবং সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ক্যাটারাক্টের মতো সমস্যার জন্য অস্ত্রোপচার কার্যকরী হতে পারে, যেখানে রিফ্রাকটিভ ত্রুটির জন্য চশমা বা লেন্স প্রয়োজন।
তাছাড়া দৃষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এসব কেন্দ্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করে, যা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করে তোলে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষার পদ্ধতি
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ব্রেইল পদ্ধতি হলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রধান পাঠদান পদ্ধতি, যা স্পর্শের মাধ্যমে শেখার সুযোগ দেয়। এছাড়া বড় অক্ষরের বই, অডিওবুক এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্কুল এবং কলেজে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হলে তারা মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হয়।
এ ক্ষেত্রে নিচের পদ্ধতিগুলো কার্যকরী:
১) ব্রেইল পদ্ধতি: এটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শেখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। এখানে স্পর্শের মাধ্যমে তারা পাঠ্যবস্তু বোঝে।
২) অডিওভিত্তিক শিক্ষা: অডিওবুক এবং অডিও ক্লাসের ব্যবহার। শ্রুতিনির্ভর শিক্ষার ব্যবস্থা।
৩) ডিজিটাল প্রযুক্তি: স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার, যা টেক্সটকে অডিওতে রূপান্তরিত করে। ধরনের কম্পিউটার এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার।
সমাজে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা, তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিভিন্ন সহায়ক প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে তাদের জীবনকে সহজ করা যেতে পারে।
উপসংহার
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সঠিক চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজের সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা তাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সকলে মিলে কাজ করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের বিষয়ক যেকোনো আপডেট তথ্য, ভাতা ও অনুদান সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন প্রতিবন্দী বিডি ডট কম।

প্রতিবন্ধী বিডি একটি সেবামূলক ওয়েবসাইট যেখানে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী শ্রেনীর নাগরিকদের প্রদানকৃত ভাতা ও অন্যান্য সেবা সমূহ নিয়ে তথ্য প্রদান করে থাকে। এছাড়াও সরকার দ্বারা প্রদানকৃত অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ সুবিধা নিয়েও জানানো হয়ে থাকে। তবে এটা কোনো সরকারি ওয়েবসাইট নয়।